ঢাকা ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

নদীভাঙনে হারিয়েছেন ভিটেমাটি, মিষ্টির দোকান ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন হিরা

কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গড়ে তোলা মিষ্টির দোকানের সামনে হিরা মণ্ডল ও তাঁর তিন সন্তান। বৃহস্পতিবার সকালেছবি: প্রথম আলোকপোতাক্ষ নদের পাড় ঘেঁষে কাশির হাটখোলায় ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান। কাচের বাক্সে সারি সারি সাজানো রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, গজা। সামনে আরেকটি বাক্সে পেঁয়াজু ও শিঙাড়া। দোকানের এক পাশে খেলছে তিন শিশু। আর ভেতরে মিষ্টির পাত্র গুছিয়ে রাখছেন এক নারী। তাঁর নাম হিরা মণ্ডল (৩০)। ব্যবসা কেমন চলছে—জানতে চাইলে মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘এই তো ব্যবসা চলতিছে কোনো রকমে। অনেক কষ্ট কইরে আবার দোকানডা দাঁড় করাইছি। এখন নতুন করে শুরু করছি সব।’

বৃহস্পতিবার সকালে দোকানে বসেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন হিরা মণ্ডল। কখনো পাত্র গোছাচ্ছেন, কখনো সন্তানদের দিকে নজর রাখছেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফিরে যাচ্ছিলেন ছয় বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিতে।

হিরা মণ্ডলের এই নতুন করে শুরু করা কেবল একটি দোকান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কপোতাক্ষ নদের ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব, ভিটেমাটি হারানোর বেদনা এবং এক নারীর টিকে থাকার লড়াই। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাশির হাটখোলা একসময় ছিল নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। কপোতাক্ষ নদ দিয়ে ধোলাই নৌকায় করে দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা আসতেন। প্রতি মঙ্গলবার বসত জমজমাট হাট। এই হাটের নদী ঘেঁষা অংশেই ছিল হিরা মণ্ডল ও তাঁর স্বামী বিশ্বজিৎ মণ্ডলের ছোট্ট মিষ্টির দোকান এবং বসতভিটা। সাধারণ মিষ্টি ও ডাল-ভাত বিক্রি করেই চলত সংসার। স্বপ্ন ছিল একদিন দোকান বড় হবে ছানার রসগোল্লা, সন্দেশ, চমচমসহ নানা মিষ্টি তৈরি হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়ায় কপোতাক্ষ। ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানে উপকূলে। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় প্রবল বাতাস। মুহূর্তের মধ্যে উড়ে যায় ঘরের টিনের চাল, দোকানের বেড়া। এরপর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তাঁদের দোকান ও বসতভিটা।

হিরা মণ্ডল বলেন, ‘চোখের সামনে সব শেষ হইয়ে গেল। কিছুই বাঁচাতি পারিনি। মেয়েডারে নিয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে পালাইছিলাম।’

সেদিন তাঁদের বড় মেয়ে পূজার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কাশির হাটখোলা বেড়িবাঁধের উঁচু অংশে। সেখানে আরও অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নেয়। বাঁধের ওপর তাঁবু খাটিয়ে শুরু হয় এক অনিশ্চিত জীবন। একই জায়গায় খাওয়া, ঘুম, রান্না—সবকিছু। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে চলত দিন।

হিরা বলেন, ‘কপোতাক্ষ শুধু ঘর নেইনি, জমিও নেগেছে। ফেরার মতোন কোনো জায়গা আর ছিল না।’

১৩ জুন, ২০২৬ ইং
শনিবার
নদীভাঙনে হারিয়েছেন ভিটেমাটি, মিষ্টির
দোকান ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন হিরা
বিস্তারিত কমেন্টে >>>
🌐 themedia.com.bd
ট্যাগঃ
জনপ্রিয়

নদীভাঙনে হারিয়েছেন ভিটেমাটি, মিষ্টির দোকান ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন হিরা

আপডেটঃ ০৯:৩০:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গড়ে তোলা মিষ্টির দোকানের সামনে হিরা মণ্ডল ও তাঁর তিন সন্তান। বৃহস্পতিবার সকালেছবি: প্রথম আলোকপোতাক্ষ নদের পাড় ঘেঁষে কাশির হাটখোলায় ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান। কাচের বাক্সে সারি সারি সাজানো রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, গজা। সামনে আরেকটি বাক্সে পেঁয়াজু ও শিঙাড়া। দোকানের এক পাশে খেলছে তিন শিশু। আর ভেতরে মিষ্টির পাত্র গুছিয়ে রাখছেন এক নারী। তাঁর নাম হিরা মণ্ডল (৩০)। ব্যবসা কেমন চলছে—জানতে চাইলে মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘এই তো ব্যবসা চলতিছে কোনো রকমে। অনেক কষ্ট কইরে আবার দোকানডা দাঁড় করাইছি। এখন নতুন করে শুরু করছি সব।’

বৃহস্পতিবার সকালে দোকানে বসেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন হিরা মণ্ডল। কখনো পাত্র গোছাচ্ছেন, কখনো সন্তানদের দিকে নজর রাখছেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফিরে যাচ্ছিলেন ছয় বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিতে।

হিরা মণ্ডলের এই নতুন করে শুরু করা কেবল একটি দোকান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কপোতাক্ষ নদের ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব, ভিটেমাটি হারানোর বেদনা এবং এক নারীর টিকে থাকার লড়াই। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাশির হাটখোলা একসময় ছিল নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। কপোতাক্ষ নদ দিয়ে ধোলাই নৌকায় করে দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা আসতেন। প্রতি মঙ্গলবার বসত জমজমাট হাট। এই হাটের নদী ঘেঁষা অংশেই ছিল হিরা মণ্ডল ও তাঁর স্বামী বিশ্বজিৎ মণ্ডলের ছোট্ট মিষ্টির দোকান এবং বসতভিটা। সাধারণ মিষ্টি ও ডাল-ভাত বিক্রি করেই চলত সংসার। স্বপ্ন ছিল একদিন দোকান বড় হবে ছানার রসগোল্লা, সন্দেশ, চমচমসহ নানা মিষ্টি তৈরি হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়ায় কপোতাক্ষ। ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানে উপকূলে। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় প্রবল বাতাস। মুহূর্তের মধ্যে উড়ে যায় ঘরের টিনের চাল, দোকানের বেড়া। এরপর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তাঁদের দোকান ও বসতভিটা।

হিরা মণ্ডল বলেন, ‘চোখের সামনে সব শেষ হইয়ে গেল। কিছুই বাঁচাতি পারিনি। মেয়েডারে নিয়ে শুধু প্রাণটা নিয়ে পালাইছিলাম।’

সেদিন তাঁদের বড় মেয়ে পূজার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কাশির হাটখোলা বেড়িবাঁধের উঁচু অংশে। সেখানে আরও অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নেয়। বাঁধের ওপর তাঁবু খাটিয়ে শুরু হয় এক অনিশ্চিত জীবন। একই জায়গায় খাওয়া, ঘুম, রান্না—সবকিছু। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে চলত দিন।

হিরা বলেন, ‘কপোতাক্ষ শুধু ঘর নেইনি, জমিও নেগেছে। ফেরার মতোন কোনো জায়গা আর ছিল না।’

১৩ জুন, ২০২৬ ইং
শনিবার
নদীভাঙনে হারিয়েছেন ভিটেমাটি, মিষ্টির
দোকান ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন হিরা
বিস্তারিত কমেন্টে >>>
🌐 themedia.com.bd