বিশাল বাজেট, বড় তারকা আর ব্যাপক প্রচারণা ছাড়াই চমকে দিয়েছে দুই সিনেমা।
সাম্প্রতিক সময়ে অল্প বাজেটে নির্মিত অনেক হরর সিনেমাই দুনিয়াজুড়ে তোলপাড় তুলেছে। গত বছরের আলোচিত অস্ট্রেলিয়ান সিনেমা ‘ব্রিং হার ব্যাক’-এর কথা মনে আছে নিশ্চয়। চলতি বছর সেই সাফল্যের গল্প লিখছে ‘অবসেশন’ ও ‘ব্যাকরুমস’। বিশাল বাজেট, বড় তারকা আর ব্যাপক প্রচারণা ছাড়াই চমকে দিয়েছে দুই সিনেমা। ‘ব্রিং হার ব্যাক’-এর মতো আলোচিত দুই সিনেমার নির্মাতাই ইউটিউবার। অবসেশন বানিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী ক্যারি বার্কার; ‘ব্যাকরুমস’–এর পরিচালক কেন পারসনসের বয়স মাত্র ২০!
ইউটিউবারের স্বপ্ন বন্ধু কুপার টমলিনসনের সঙ্গে ক্যারি বার্কার চালু করেছিলেন ‘দ্যাটস আ ব্যাড আইডিয়া’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে তাঁরা কমেডি স্কেচ, ছোটগল্প ও পরীক্ষামূলক ভিডিও বানাতেন। ক্যামেরার সামনে হাস্যরসের ভিডিও বানানোর আড়ালে বার্কার শিখছিলেন গল্প বলা, সম্পাদনা, ক্যামেরা পরিচালনা ও দর্শকের মনস্তত্ত্ব। পরে তিনি বলেছিলেন, ইউটিউবই ছিল তাঁর ‘ফিল্ম স্কুলের বাইরের ফিল্ম স্কুল’। শৈশব থেকেই বার্কার হরর সিনেমার ভক্ত। বিশেষ করে ‘দ্য টেক্সাস চেইন শ ম্যাসাকার’ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই আগ্রহই একসময় তাঁকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়ে আসে।
বিস্তারিত
কেন পারসনসের গল্পও প্রায় একই রকম। ২০১৫ সালে নিজের ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন। প্রথম দিকে তিনি মিম কনটেন্ট ও ছোটখাটো পরীক্ষামূলক ভিডিও বানাতেন। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিনি ৪০০টির মতো ভিডিও তৈরি করেছিলেন, যার বেশির ভাগই পরে প্রাইভেট করে দেন। কৈশোরে তিনি ইউটিউব দেখে ভিজ্যুয়াল এফেক্টস, থ্রিডি অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফি আয়ত্ত করেন। ২০২১ সালে তিনি জনপ্রিয় জাপানি সিরিজ ‘অ্যাটাক অন টাইটান’–এর প্রেরণায় কিছু ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেটেড ভিডিও তৈরি করেন। এই ভিডিওগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং তাঁর চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়।
সিনেমার জাদুক্যারি বার্কারের প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ২০২৪ সালের চলচ্চিত্র ‘মিল্ক অ্যান্ড সেরিয়াল’। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ছবিটির বাজেট ছিল মাত্র ৮০০ ডলার। বন্ধুদের নিয়ে একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলেন তিনি। ছবিটি সরাসরি ইউটিউবে প্রকাশ করেন। সিনেমাটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। দর্শক বুঝতে পারেন, এই তরুণ নির্মাতার মধ্যে আলাদা কিছু আছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও তিনি ভয় ও উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। এ ছবিই ভবিষ্যতে বড় সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
২০২৫ সালে বার্কার নির্মাণ করেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অবসেশন’। স্বল্প বাজেটের এই হরর চলচ্চিত্র প্রথম প্রদর্শিত হয় টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে। দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়। ছবিটির স্বত্ব কিনে নেয় ফোকাস ফিচারস। গত মে মাসে মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি আয় করে প্রায় সাত মিলিয়ন ডলার। এরপর শুরু হয় মুখে মুখে প্রচারণা। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ দর্শকদের মধ্যে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের সিনেমাটি এরই মধ্যে ১০০ মিলিয়নের বেশি আয় করেছে।এবার আসা যাক ‘ব্যাকরুমস’–এর গল্পে। ‘ব্যাকরুমস’ নামটি অনেকের কাছেই পরিচিত। এটি মূলত ইন্টারনেটের একটি জনপ্রিয় হরর কিংবদন্তি। ধারণাটি প্রথম ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ফোরামে। গল্প অনুযায়ী, বাস্তবতার কোনো ফাঁক দিয়ে হঠাৎ কেউ যদি পৃথিবীর পরিচিত জগৎ থেকে বেরিয়ে যায়, তবে সে আটকা পড়ে হলুদ দেয়ালে ঘেরা এক অন্তহীন গোলকধাঁধার মতো জায়গায়—যার নাম ব্যাকরুমস।
এই ধারণাকে কেন্দ্র করে ২০২২ সালে ইউটিউবে একাধিক শর্ট হরর ভিডিও তৈরি করেন কেন পারসনস। ভিডিওগুলো দ্রুত ভাইরাল হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই সিরিজটির ভিউ দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি। সেই ইউটিউব সিরিজই পরে নজরে আসে হলিউডের। এ২৪ স্টুডিও তাঁর প্রতিভায় আস্থা রাখে। স্টুডিওটি সিদ্ধান্ত নেয়, ‘ব্যাকরুমস’কে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে তৈরি করা হবে, পরিচালনার দায়িত্ব পারসনসের হাতেই থাকবে। এটি ছিল এক অর্থে বড় ঝুঁকি। কারণ, চলচ্চিত্র মুক্তির সময় তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর। কিন্তু ফলাফল প্রমাণ করেছে, সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না।মুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ৩ হাজার ৪৪২টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি। প্রথম সপ্তাহান্তেই ছবিটি আয় করে ৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার। কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী ছবিটির মোট আয় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ২৪-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্বোধনী আয় করা সিনেমা এখন ব্যাকরুমস।
দ্য হলিউড রিপোর্টার, ভ্যারাইটি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
দ্য মিডিয়া ডেস্ক 



















